শনিবার ১৩ জুন ২০২৬
Online Edition

বিভক্তির রাজনীতি কল্যাণকর নয়

অ্যাডভোকেট তোফাজ্জল বিন আমীন
৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার রক্তাক্ত অভ্যুত্থানে স্বৈরাচারের পতন সর্বত্র স্বস্তির বাতাস বইতে শুরু করে। জাতির কাঁধে চেপে বসা পতিত স্বৈরাচারকে দীর্ঘ ১৭ বছর যেখানে রাজনৈতিক দলগুলো বিতাড়িত করতে পারেনি সেখানে তারুণ্যের রক্তের স্রোতে স্বৈরাচার পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। আওয়ামী লীগের অন্ধ অনুসারী ব্যতিত পুরো জাতি সেদিন এক অভূতপূর্ব মেলবন্ধন গড়ে তুলেছিল। এ ঐক্য দেশের সকল রাজনৈতিক দলগুলোকে ধরে রাখা প্রয়োজন। তা না হলে দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি হুমকির মধ্যে পড়তে পারে। কিন্তু এক শ্রেণি রাজনৈতিক নেতাদের বক্তব্যে বিভক্তির সুর বাজছে।
আওয়ামী সরকার জামায়াত বিএনপির ঐক্য বিনষ্ট করার জন্য এমন কোন হীন অপকর্ম নেই, যা তারা করেনি। তারপরও দল দুটির ভেতর সূদৃঢ় ঐক্যের বন্ধন ছিন্ন করা যায়নি। কথিত আছে যে, রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কোন কথা নেই। নিজেদের স্বার্থই বড় কথা? জামায়াতে ইসলামী আর বিএনপির ভেতর যদি ঐক্যের ফাটল ধরে তাহলে লাভবান হবে কারা? গণতন্ত্রের স্বার্থে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে প্রতিযোগিতা থাকুক। কিন্তু প্রতিযোগিতার নামে প্রতিহিংসার রাজনীতির চাষাবাদ বন্ধ করা প্রয়োজন। প্রতিহিংসার রাজনীতি কখনো সুখকর হয় না। জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে দীর্ঘ ১৭ বছর আওয়ামী লীগ যে বয়ান দিয়েছে সে একই বয়ান যখন বিএনপির কিছু নেতাদের মুখ থেকে শুনি তখন বিচলিত না হয়ে পারা যায় না। বিএনপির নেতারা কী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার কথা ভুলে গেছেন। ২০১১ সালে ময়মনসিংহ সার্কিট হাউস মাঠে আয়োজিত জনসভায় ভাষণদানকালে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে গ্রেফতার হওয়া জামায়াতে ইসলামীর আমীর মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী ও সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মুজাহিদের মুক্তি দাবি করেছিলেন। (২৭ অক্টোবর, ২০১১, বাংলা নিউজ টোয়েন্টিফোর.কম) ১৯৭১ সালে জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকা কী ছিল তা কারও অজানা নয়। সেই পুরানো কাসুন্দি বাজিয়ে লাভ কী?
জামায়াত কোন ব্যক্তি কেন্দ্রিক কিংবা পরিবারতন্ত্রের রাজনৈতিক দল নয়। এ দলটির উত্থান-পতনের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে দলটির শিকড় নেতা-কর্মীদের কলিজার ভেতর গেঁথে রাখা। ফলে মৃত্যু ছাড়া তাদের বিচ্ছেদ হয় না। এরকম একটি আদর্শবাদী দলের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করা যায়; কিন্তু তাদের নীতি নৈতিকতা ও সততার বিরোধীতা করা কঠিন। সম্প্রতি দীপ্ত টিভির এক টকশোতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান জনাব বদিউল রহমান বলেছেন- জামায়াতে ইসলামী দেশপ্রেমিক কিনা জানি না, তবে জামায়াতের নেতাদের মধ্যে সততা আছে। আমি জামায়াতে ইসলামীর দুই মন্ত্রীর সাথে কাজ করেছি। তারা যখন সরকারি কাজে বাহিরে যেতেন তখন সরকারি টাকা খরচ করতেন। আবার যখন তাদের কর্মীদের সাথে মিটিং করতেন তখন কিন্তু সরকারি টাকা খরচ করতেন না, পার্টির টাকা খরচ করতেন। এটা অন্যদলের মধ্যে খুঁজে পাওয়া মেলা ভার।
আর বিএনপির সর্ম্পক প্রায় দুই যুগের বেশি সময় ধরে। ১৯৯১ সালে বিএনপি জামায়াতের সমর্থনে ক্ষমতায় এসেছিল। তখন জামায়াতের বিরুদ্ধে বিএনপির নেতৃবৃন্দ কোন বিষেদগার করেননি। ১৯৯৯ সালে আওয়ামী লীগকে ঠেকাতে চারদলীয় জোট গঠিত হয় তখন তো জামায়াতের বিরুদ্ধে বিএনপির নেতারা কোন অভিযোগ উত্থাপন করেননি। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসেই ৭১ টার্মকাড ব্যবহার করে জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধীদের অভিযোগ উত্থাপন করে এবং শেষ পর্যন্ত ফাঁসি দেয়। মূলত আওয়ামী লীগ চারদলীয় জোট গঠনের পর থেকেই চেষ্টা করেছে জামায়াতে ইসলামীকে বিএনপি থেকে আলাদা করতে। ২০০৫ সালের ১৩ মার্চ চারদলীয় জোটের অন্যতম নেতা ও মন্ত্রী জামায়াতের আমীর মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী সংসদে বলেছিলেন, চারদলীয় এক্য জোটে ফাটল ধরানোর জন্য আওয়ামী লীগ কল্পিত জঙ্গিবাদের অপপ্রচার চালাচ্ছে। আওয়ামী লীগ নেই। কিন্তু বিএনপির কিছু নেতা জামায়াতে ইসলামী সম্পর্কে আওয়ামী লীগের ভাষায় কথা বলার চেষ্টা করছেন-যার কিছু নমুনা নিচে তুলে ধরা হলো :
সম্প্রতি জামায়াতের প্রতি ইঙ্গিত করে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী বলেছেন ৫ আগস্টের পর একটি রাজনৈতিক দলের আত্মসাৎ দেখেছে জনগণ। কারা পায়ের রগ কাটে তাদের জনগণ চেনে। আমি সেই রাজনৈতিক দলটিকে বলতে চাই, খুব নীরবে আপনার সব অপকর্মের সঙ্গে জড়িত। শেখ হাসিনার ব্যাংক আত্মসাতের পর ৫ আগস্টের পর আপনাদের আত্মসাতের ঘটনাও জনগণ দেখেছে। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী জামায়াত ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের চেষ্টা করছে। (৪ জানুয়ারি ২০২৫, ভোরের কাগজ)। ৯ জানুয়ারি বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাব মিলনায়তনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দল কর্তৃক ৭১ এর মুক্তিযুদ্ধই জাতির হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ অহংকার শীর্ষক সমাবেশে তিনি বলেন- আমরা ভেবেছিলাম এখন একটা সুযোগ এসেছে; এই সুযোগে তারা (জামায়াত ইসলামী) একাত্তরের ভূমিকা নিয়ে জনগণের কাছে ক্ষমা চাইবে। সেটি না করে তারা একাত্তরের তাদের ভূমিকাকে জাস্টিফাই করছে এবং দেশপ্রেমিক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে (৯ জানুয়ারি ২০২৫, যুগান্তর)।
বিএনপির নেতাদের তির্যক মন্তব্যে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান এক বিবৃতিতে বলেন, বিএনপি নেতা রুহল কবির রিজভী জামায়াত সম্পর্কে ‘ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে হাসিনাকে ক্ষমা করতে চায় জামায়াত’ মর্মে যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা বিভ্রান্তিকর, ভিত্তিহীন ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। বিবৃতি তিনি আরও বলেন, রুহুল কবির রিজভী জামায়াতের দিকে ইঙ্গিত করে বলেছেন- à§« আগস্টের পর একটি রাজনৈতিক দলের আত্মসাৎ দেখেছে জনগণ, কারা পায়ের রগ কাটে তাদের চিনে জনগণ, ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের চেষ্টা করছে একাত্তরের বিরোধিতাকারী জামায়াত।’ রিজভীর এ জাতীয় বক্তব্য বিগত কয়েক দশক ধরে প্রচার করা হচ্ছে। রগ কাটা, ঘোলা পানিতে মাছ শিকার, à§­à§§ এর বিরোধিতা এ সব বক্তব্য জনগণ বহু পূর্বেই প্রত্যাখ্যান করেছে। রিজভী জামায়াতের বিরুদ্ধে এসব কথা উচ্চারণ করে কী অর্জন করতে চান, তা জনগণের কাছে স্পষ্ট নয়।
জামায়াত রগকাটা ও ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের রাজনীতি কখনো করেনি। তিনি জামায়াতের দিকে ইঙ্গিত করে ‘ইসলাম নিয়ে রাজনীতি করেন, ইসলাম মানে তো বারবার মোনাফেকি করা না; তার এই বক্তব্য চরম মিথ্যাচার ছাড়া আর কিছু নয়, বলেন রফিকুল ইসলাম খান। বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, জামায়াত ‘ইসলাম’ নিয়ে রাজনীতি করে না। ইসলামী আদর্শের ভিত্তিতে রাজনীতি করে জামায়াত। জামায়াত দেশের মানুষের অধিকার, আইনের শাসন, ন্যায়বিচার, মানবাধিকার ও ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য আপসহীনভাবে লড়াই করেছে। জামায়াত কখনো মোনাফেকির আশ্রয় নেয়নি। রিজভী অবশ্যই অবগত আছেন ২০১৮ সালে প্রতিষ্ঠিত জোটকে এড়িয়ে ভিন্ন মতের লোকদের সঙ্গে জোট করে ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য যে ঐক্য করা হয়েছিল তা কী জাতির সঙ্গে মোনাফেকি নয়? জনগণ এই রাজনৈতিক ছন্দ পতনের ইতিহাস ভুলে যায়নি। বিবৃতিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, জামায়াতের রাজনীতি ভারতের আধিপত্যবাদ ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে। জামায়াতের এই ভূমিকা গোটা জাতি গ্রহণ করেছে। আর এ কারণেই সম্ভবত রিজভীর গাত্রদাহ সৃষ্টি হয়েছে। আমরা এ ধরনের বিভ্রান্তিকর ও অপবাদ আরোপের রাজনীতি থেকে বিরত থাকার জন্য সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি (সূত্র : ৩০ ডিসেম্বর ২০২৪, যুগান্তর)। ভিনদেশীয় শুকুনদের হাত থেকে দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব রক্ষা করার স্বার্থে দুই দলের মধ্যে সীসাঢালা প্রাচীরের ন্যায় ঐক্য ধরে রাখা প্রয়োজন। কারণ এ দুদলের মধ্যে কাঁদাছুড়াছুড়ি থাকলে তৃতীয় শক্তি দেশকে সিরিয়া কিংবা গাজায় পরিণত করতে পারে।
বিএনপি-জামায়াতের মধ্যে ঐক্য না থাকলে ফ্যাসিবাদ পুনর্বাসিত হতে পারে। আমরা দু’দলের প্রতিযোগীতা প্রত্যাশা করি। কিন্তু প্রতিহিংসার রাজনীতি প্রত্যাশা করি না। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে যারা অংশগ্রহণ করেছে তাদের মধ্যে অনেকে চোখ, অনেকে হাত, অনেকে পা, অনেকে প্রাণ হারিয়েছে। এসব মানুষের আত্মত্যাগের সাথে বেঈমানী করা মোটেও সুখকর হবে না। দেশের বিরাজমান রাজনৈতিক বাস্তবতার নিরীখে বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামীর নেতৃবৃন্দ বিভক্তির পথে না হেঁটে জাতির কল্যাণে কাজ করবে, এমনটিই আমাদের প্রত্যাশা। লেখক : আইনজ্ঞ ও কলামিস্ট

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ